কে এই দাজ্জাল?
নবীজীর আমলেই দাজ্জালের আবির্ভাব:-
সবাই চুপচাপ। গভীর মনোযোগসহকারে শুনছে সবাই কথাগুলো আলোচনা শুনতে শুনতে তাদের চেহারায় একধরনের চিন্তার ছাপ ফুটে উঠছে! কপালের বলিরেখাগুলো আরো খানিকটা কুচকে যাচ্ছে, ভাঁজ পড়ে যাচ্ছে! ভয়ে কুকড়ে যাচ্ছে উপবিষ্ট মানুষগুলো। কেউ ভয়ে কাঁদতে শুরু করেছে! 'কী ভয়ঙ্কর হবে তাহলে বিষয়টি! কীভাবে বাঁচা যাবে? তাকে আমরা কীভাবে চিনব? এমনই একটি ভাবনা সবার মধ্যে। তাদের ভাবনাই হয়ত দূর করতে বিষয়টি একটু সহজ করে দিলেন:
লোকটিকে তোমরা চিনবে
“তার দাঁতগুলো বড় বড় হবে। তার দ্বারা কোনো উপকারী ভালো কাজ হবে না। অন্যান্য ছেলে-মেয়েরা যেভাবে মাতা-পিতাকে ঘরের ভেতরে বাহিরে বিভিন্ন কাজে সাহায্য করে থাকে, সে তেমনটি করবে না। ছেলেটির দু-চোখ ঘুমাবে; কিন্তু তার অন্তর জাগ্রত থাকবে!
আর তার মাতা-পিতা কেমন হবে?
‘পিতা হবে অস্বাভাবিক লম্বা এবং হালকা গড়নের। দেহে গোশত কম থাকবে। তার নাসিকা মোরগের মত লম্বা ও চিকন আকৃতির হবে। আর তার মা-ও হবে লম্বা ও প্রশস্ত স্তন বিশিষ্ট। হাত হবে বেশ লম্বা। মোটা চুড়ি পরিধান করবে তাতে।
এর বেশ কিছুদিন পর শোনা গেল, মদিনার মধ্যে একটি আশ্চর্য ও বিরল প্রকৃতির ছেলে বিদ্যমান! যেসব গুণাগুণ উপরে বর্ণনা করা হয়েছে, সবই তার মধ্যে এবং তার মা-বাবার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। তার মা-বাবাকে জিজ্ঞেস করা হলো, তোমাদের কি কোনো ছেলে সন্তান রয়েছে? তারা বলল, 'আমরা ত্রিশ বৎসর যাবৎ বৈবাহিক জীবন যাপন করছি, আমাদের কোনো সন্তান হয় নি। ত্রিশ বছর পর আমাদের একটি কানা ছেলে সন্তানের জন্ম হয়েছে, যার দাঁতগুলো লম্বা-লম্বা। তাকে দিয়ে কোনো ভালো কাজ করানো যায় না। তার চোখ ঘুমায়, তবে অন্তর জাগ্রত থাকে!'
একবার ছেলেটি চাদর গায়ে রোদের মধ্যে শুয়ে ছিল; চাদরের ভেতর থেকে কী এক ধরনের গুনগুনানির আওয়াজ আসছিল। মনে হচ্ছিল, ঘুমের ঘোরে সে কিছু বলছে! তাকে দেখতে আসা লোকদ্বয় পরস্পরে কিছু কথা আলোচনা করল। হঠাৎ ছেলেটি মাথা থেকে চাদর সরিয়ে জিজ্ঞেস করল, তোমরা কী বলাবলি করছ? লোক দু-টি বলল, আমরা তো মনে করেছি, তুমি ঘুমিয়ে আছ! তুমি কি আমাদের কথা শুনে ফেলেছ? ছেলেটি বলল, 'হ্যাঁ! কারণ, আমার চোখ ঘুমায়, তবে অন্তর জাগ্রত থাকে।
আশ্চর্য এক ছেলে বটে! এই ছেলেটির নাম সাফি! তার পিতার নাম সাইয়াদ। ছেলেটিকে তাই 'ইবনে সাইয়াদ' ডাকা হয়। এভাবেই সে বেশি পরিচিত। উপরে যে আলোচনা চলছিল, যেখানে একজন মানুষের নিদর্শন বর্ণনা করা হচ্ছিল, এসব নিদর্শন পৃথিবীর শেষ সময়ে আগত মহা বিপর্যয়ের রূপকার দাজ্জালের মধ্যে পাওয়া যাবে। যার আলোচনা নবিজি তার সাহাবাদের কাছে করছিলেন। কিন্তু কি আশ্চর্য—দেখা গেলো, এসব গুণাবলি নবিজির সময়েই মদিনার ইহুদি বংশের সেই ইবনে সাইয়াদের মধ্যেই বিদ্যমান!
নবিজির এক সাহাবি আবু বাকারা রা. নবিজির মুখ নিসৃত নিদর্শনগুলো শোনার পর একদিন এমন একটি ছেলের সন্ধান পেলে তাকে দেখতে যান। আর গিয়ে দেখেন, নবিজির বর্ণিত গুণাবলি তার মধ্যে হুবহু পাওয়া যায়। যে কিনা মুসলিম উম্মাহ ও মানবতার সবচে' বড় শত্রু! শয়তানের মনুষ্যবন্ধুর মধ্যে সবচে' বড় সহযোগী। অসংখ্য বনি আদমকে পথ ভ্রষ্ট করে জাহান্নামে নেওয়ার জন্য শয়তানের অন্যতম হাতিয়ার। সেই ধোকাবাজ দাজ্জালের কথা, তাকে চেনার নিদর্শনাবলী নবিজি তাঁর সাহাবিদের বলেছেন, তার ফো সম্পর্কে বারবার সতর্ক করেছেন। তার অধিকাংশই পাওয়া গিয়েছিলো মদিনার সেই সাফি নামের ছেলেটি ও তার মা-বাবার মাঝে।
সাহাবিগণ নবিজিকে ছেলেটির কথা জানালেন!
সর্বনাশ! নবিজি বেশ পেরেশানিতে পড়ে গেলেন। তাকে নিয়ে তাঁর ভাবনার অন্ত ছিল না! সে-ই কি ফেত্নাবাজ-ধোকাবাজ দাজ্জাল? নবিজি বিষয়টি তদন্তে একাধিকবার চুপিচুপি তার কথা-বার্তা শোনার জন্য চেষ্টা করেছেন।
একবার সাহাবাদের একটি দলসহ নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইবনে সাইয়াদের কাছে গেলেন। ইবনে সাইয়াদ তখন ইহুদি গোত্র বনু মুগালায় তার সঙ্গীদের নিয়ে খেলায় মগ্ন ছিল। সে তখন স্বাবালক হওয়ার কাছাকাছি। ইবনে সাইয়াদ খেলায় মগ্ন থাকার কারণে আগত নবিজি এবং সাহাবিদের দেখতে পেল না। অবশেষে নবিজি তার পিঠে মৃদু আঘাত করলেন। ইবনে সাইয়াদ এবার খেলা ফেলে নবিজির দিকে মনোনিবেশ করলে নবিজি তাকে প্রশ্ন করলেন, 'তুমি কি বিশ্বাস করো, আমি আল্লাহর প্রেরিত রাসুল?' তা শুনে ইবনে সাইয়াদ রাগতদৃষ্টিতে নবিজির দিকে তাকাল এবং বলল, আপনি কি মনে করেন, আমি হলাম আল্লাহর রাসুল? তার প্রশ্ন শুনে নবিজি তাকে খুব শাসালেন এবং বললেন, 'আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলদের উপর বিশ্বাস করেছি!'
অন্য বর্ণনায় এসেছে, নবিজি বলেন, ধ্বংস হোক তোর, তুই আল্লাহর দুশমন!' এরপর নবিজি তাকে বললেন, 'বল তো, তুই কী কী দেখিস? অর্থাৎ, অদৃশ্যের বিষয়াবলী থেকে তোর দৃষ্টিতে কী ভাসে?' উত্তরে সে বলল, 'কখনো আমার কাছে সত্য সংবাদ আসে, আবার কখনো মিথ্যা সংবাদ আসে! আমি পানির ওপর একটি সিংহাসন দেখতে পাই।'
নবিজি তাকে বললেন, তোর ব্যাপারে সবকিছুই গড়বড় মনে হচ্ছে! আচ্ছা বল তো, আমি তোর জন্য মনে একটি কথা লুকিয়েছি, সেটি কী?' নবিজি তখন কিয়ামতের অবস্থা বর্ণিত সুরা দুখানের ১০নং আয়াত কল্পনা করছিলেন, যেখানে ‘দুখান' শব্দটি ছিল। উত্তরে সে বলল, ‘দুখ।' অর্থাৎ, উপরে বর্ণিত আয়াতের দুখান শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপ উচ্চারণ করল। তার উত্তর শুনে রাগতস্বরে নবিজি বললেন, 'দূর হয়ে যা, তুই তোর নির্ধারিত সময়ের আগে কিছুই করতে পারবি না!'
পরিস্থিতি ও নবিজির অবস্থা দেখে হযরত উমর বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, নির্দেশ দিন, আমি তার গর্দান উড়িয়ে দেব!' নবি কারিম সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘সে-ই যদি দাজ্জাল হয়, তবে তুমি তাকে মারতে পারবে না! কারণ, তাকে হত্যার বিষয়টি আল্লাহ তায়ালা ঈসা ইবনে মারয়ামের হাতে লিখে রেখেছেন! আর যদি দাজ্জাল না হয়, তবে তাকে হত্যা করে কোনো লাভ নেই।
আরেকদিন নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয় সাল্লাম তার বাড়ির পাশের খেজুর বাগানে গেলেন, যেখানে সে অবস্থান করছিল। নবিজি বাগানের একটি গাছের আড়ালে লুকাতে চাইলেন, যাতে তার অগোচরে তার কিছু কথা-বার্তা শুনতে পারেন। এমন সময় ইবনে সাইয়াদের মা তাকে ডেকে বলল, 'হে সাফি, ঐ তো মুহাম্মাদ এসে গেছে।' এ-কথা শোনামাত্রই ইবনে সাইয়াদ তার গুনগুনানি বন্ধ করে দিলো। নবিজি বললেন, তার মা যদি তাকে বাঁধা না দিত, তবে আজকে সে তার আসল চেহারা প্রকাশ করে দিত! এভাবে নবিজি তার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করার জন্য এবং সে যে গুনগুনিয়ে কথা বলে, তা শোনার জন্য একে একে তিন দিন গিয়েছিলেন। আর প্রতিদিনই তার মা তাকে এভাবে সতর্ক করে দেয়। আর তাই, নবিজি সাহাবাদেরকে তার ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেন নি যে, সেই দাজ্জাল কি-না!
এই ঘটনার পর যখন নবিজি ভাষণ দেওয়ার জন্য দাঁড়ালেন। আল্লাহর প্রশংসা শেষে দাজ্জালের আলোচনা করলেন এবং বললেন, 'আমি তোমাদেরকে দাজ্জাল সম্পর্কে সতর্ক করছি। নুহ আলাইহিস সালাম-এর পর এমন কোনো নবি যান নি, যিনি তাঁর জাতিকে দাজ্জাল সম্পর্কে সতর্ক করেন নি! তবে আমি তোমাদেরকে দাজ্জাল সম্পর্কে এমন একটি কথা বলব, যা ইতোপূর্বে কোনো নবি বলেন নি। জেনে রাখো, দাজ্জাল কিন্তু এক চোখে কানা হবে। আর আল্লাহ তায়ালা কানা নন!!
হযরত আব্দুল্লাহ বিন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, চলার পথে একবার ইবনে সাইয়াদের সঙ্গে আমার সাক্ষাত ঘটল। তখন তার এক চোখ ফুলে উঠেছিল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কী ব্যাপার, তোর চোখের এ অবস্থা কেন? সে বলল, ‘জানা নেই!” আমি বললাম, 'চোখ তোর মাথায় আর তুই জানিস না?' সে বলল, 'প্রভু চাহেন তো, আপনার লাঠির মাথায় আমি একটি চোখ তৈরি করে দিতে পারি!' অতঃপর ইবনে সাইয়াদ নাক দিয়ে স্বজোরে গাধার মত একটি আওয়াজ করল।' (মুসলিম শরিফ।
আবু সাইদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘এক ভ্রমণে আমি এবং ইবনে সাইয়াদ এক কাফেলায় ছিলাম। সে আমার কাছে তার দুঃখের কথা বর্ণনা করছিল, 'দেখ, লোকেরা আমাকে দাজ্জাল বলে! হে আবু সাইদ, তুমি কি নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শোন নি, দাজ্জালের কোনো সন্তান হবে না। অথচ আমার সন্তান আছে! নবিজি কি বলেন নি, 'দাজ্জাল কাফের হবে', অথচ আমি মুসলমান! নবিজি কি বলেন নি, 'দাজ্জাল মক্কা-মদিনায় প্রবেশ করতে পারবে না', অথচ আমি মদিনার অধিবাসী এবং মক্কায় হজে যাচ্ছি।' আবু সাইদ বলেন, পরিশেষে ইবনে সাইয়াদ আমাকে বলল, "স্মরণ রেখো, আল্লাহর শপথ করে বলছি, 'অবশ্যই আমি দাজ্জালের জন্মকাল সম্পর্কে জানি। তার জন্মস্থান সম্পর্কে ভালভাবে জানি! এও জানি, বর্তমানে সে কোথায় অবস্থান করছে। তার মা-বাবাকেও ভাল করে চিনি।”
আবু সাইদ বলেন, 'তার কথা শুনে আমি সন্দেহে পড়ে গেলাম। আমি বললাম, তোর ধ্বংস অনিবার্য!' কাফেলার একজন বলল, তোকে যদি দাজ্জাল বানিয়ে দেওয়া হয়, তবে তোর কেমন লাগবে? একথা শুনে সে বলল, অবশ্যই ভালো লাগবে! (আমি রাজি আছি!) (মানুষকে গুমরাহ করার অলৌকিক ও জাদুময় বিষয় দাজ্জালকে দেওয়া হবে।) সেসব যদি আমাকে দেওয়া হয়, তবে দাজ্জাল হওয়া আমি খারাপ মনে করব না!' [মুসলিম শরিফ:
হঠাৎ করেই যেন ইবনে সাইয়াদ মদিনা থেকে উধাও হয়ে গেল। তাকে আর আরবে দেখা গেল না। জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ইবনে সাইয়াদ ‘হাররা' নামক ঐতিহাসিক ঘটনার স্থানে গুম হয়েছে। এরপর সে আর ফিরে আসে নি।' (আবু দাউদ শরিফ)
আরো একটি ঘটনা। ঘটনাটি বলেছেন হাস্সান বিন আব্দুর রহমান। তিনি বলেন, 'আসফাহান যখন বিজয় হল। আমাদের সেনাকেন্দ্র আর ইহুদিয়া বস্তির মাঝে দূরত্ব খুব বেশি ছিল না! নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের জন্য আমরা প্রায়ই ইহুদিয়া বস্তিতে যেতাম। একদিন দেখি, সেখানের ইহুদিরা নেচে-গেয়ে আনন্দ করছে। জিজ্ঞেস করলাম, ব্যাপার কী, এত আনন্দ কীসের? তারা আমাকে বলল, আজ আমাদের মুক্তিদাতা মহান বাদশার আগমন হবে! যার নেতৃত্বে আমরা আবার পুনরায় আরবদের উপর বিজয় অর্জন করব। তার কথা শুনে আমি একটি উঁচু টিলায় উঠলাম এবং তাকে দেখতে সেখানে রাত্রি যাপন করলাম। যখন প্রায় সকাল পার হয়ে যাওয়ার অবস্থা, তখন দেখলাম,আমাদের সেনাকেন্দ্রের দিক থেকে ধূলোবালি উড়ছে। যে এগিয়ে আসছে, তার পরনে রাইহান সুগন্ধিযুক্ত পোশাক। তাকে দেখে ইহুদিরা আরও বেশি নাচতে লাগলো। নিকটে আসলে লোকটিকে ভাল করে লক্ষ করলাম, আরে এ তো মদিনার সেই ইবনে সাইয়াদ! এরপর সে ইহুদিয়া বস্তিতে প্রবেশ করল। এ যাবৎ সে ওই বস্তি থেকে আর ফেরে নি!
0 মন্তব্যসমূহ