যে সব হাদীসে মেরাজ সম্পর্কে আলোচনা হয়েছে যেগুলোর ভিত্তিতে কিছু আলোচনা করছি। তারপরে
নবী করীম (সঃ) নবুয়ত প্রাপ্তির পর প্রায় বার বছর অতিবাহিত হয়েছে। তাঁর বয়স তখন বায়ান্ন বছর। হেরেমে কাবায় শুয়েছিলেন। হঠাৎ জিব্রাইল (আঃ) ফেরেশতা এসে তাঁকে জাগিয়ে দেন। আধা ঘুমন্ত অবস্থায় ও আধা জাগ্রত অবস্থায় তাঁকে তুলে যমযম কুপের নিকটে নিয়ে যান। তারপর জিব্রাইল (আঃ) ফেরেশতা নবী করীম (সঃ)-এর বক্ষ বিদীর্ণ করেন এবং তা যমযমের পানি দ্বারা ধুয়ে ফেলেন। তারপর সহনশীলতা, প্রজ্ঞা এবং ঈমান ও একীন দিয়ে সে বক্ষ পরিপূর্ণ করে দেন। এই বর্ণনাগুলো বুখারী, মুসলিম, মুসনাদে আহমদ, ইবনে জারীর, বায়হাকী, হাফেয ইবনে আবি হাতেম, তাবরানী প্রভৃতিতে হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) এবং হযরত মালেক বিন সাসায়ার বর্ণনা। অন্যান্য বর্ণনায় বলা হয়েছে, ইসরার সূচনা হয় নবী করীম (সঃ)-এর চাচাত বোন উম্মে হানীর ঘরে। সেখানে তিনি এশার নামায পড়ে ঘুমিয়েছিলেন। তাবাকাতে ইবনে সায়াদে ওয়াকেদীর বর্ণনা এই যে, ইশরার সূচনা হয় শিয়াবে আবি তালিব থেকে। বুখারী ও মুসলিমে হযরত আবু বকর (রাঃ) থেকে এবং মুসনাদে আহমদে হযরত উবাই বিন কায়াব (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, বাড়ীর ছাদ ফেড়ে হযরত জিব্রাইল (আঃ) ঘরে প্রবেশ করেন। এবং নবীকে নিয়ে যান। প্রকৃতপক্ষে এসব বর্ণনার মধ্যে কোন গড়মিল নাই। উম্মে হানি (রাঃ)-এর ঘর ছিল শিয়াবে আবু তালিবে। সে ঘরের ছাদ ফেরে জিব্রাইল (আঃ) ঘরে নামেন এবং নিদ্রাবস্থায় নবী করীম (সঃ)-কে মসজিদে হারামে নিয়ে যান।
বক্ষ বিদীর্ণ করার পর আরোহনের জন্যে একটি পশু নবী করীম (সঃ)-এর সামনে পেশ করা হয়। তহার রং ছিল সাদা। আকৃতি ছিল গাধা অপেক্ষা কিছুটা বড় এবং খচ্চর অপেক্ষা কিছু ছোট। বিদ্যুতের গতির মত গতিতে চলছিলো। তার এক একটি পদক্ষেপ দৃষ্টির শেষ সীমা পর্যন্ত। এই জন্যেই তার নাম হয়েছে বুরাক। পূর্ববর্তী নবীগণও এরূপ বুরাকে ভ্রমণ করেছেন। ইবনে আবি হাতেম, ইবনে ইসহাক, ইবনে মারদুইয়া, নাসায়ী প্রভৃতিতে আছে যে, হযরত ইব্রাহীম (আঃ) বুরাকে চড়ে হযরত হাজেরা (রাঃ) ও দুগ্ধপোষ্য সন্তান হযরত ইসমাইল (আঃ)-কে নিয়ে মক্কায় গিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁরা এ বর্ণনার উৎস বলেন নাই। যখন নবী করীম (সঃ) বুরাকের উপর সওয়ার হতে যাচ্ছিলেন তখন বুরাক নড়ে উঠলো। হযরত জিব্রাইল (আঃ) তার গায়ে মৃদু আঘাত করে বলেন, এই কি করছিস' আজ পর্যন্ত হযরত মুহাম্মদ (সঃ) ব্যতীত আর কোন মহান ব্যক্তিত্ব তোর পিঠে ছওয়ার হয় নাই । এ কথা শুনে বুরাক লজ্জা পেল এবং তার শরীর দিয়ে ঘাম বাহির হলো। তারপর নবী করীম (সঃ) তার পিঠে আরোহণ করলেন এবং জিব্রাইল (আঃ) তাঁর সাথে চলেন। নবী করীম (সঃ)-এর এই মেরাজ ভ্রমণের প্রথম মঞ্জিল ছিল মদিনা শরীফ। সেখানে নেমে তিনি নামায পড়েন। তখন জিব্রাইল (আঃ) বললেন, এখানে আপনি হিযরত করে আসবেন। দ্বিতীয় মঞ্জিল ছিল সিনাই পাহাড় যেখানে আল্লাহ পাক হযরত মুসা (আঃ)-এর সাথে কথা বলেছিলেন। তৃতীয় মঞ্জিল বায়তুল্লাহাম যেখানে হযরত ঈশা (আঃ) জন্মগ্রহণ করেন। চতুর্থ মঞ্জিল ছিল বায়তুল মাকদাস যেখানে বুরাকের সফর শেষ হয়। নাসায়ীতে আনেস বিন মালেক (রাঃ)-এর বর্ণনা এবং বায়হাকীতে শাদ্দাদ বিন আওস (রাঃ) বর্ণনা কিছু ভিন্ন। এতে সিনাই পাহাড়ের পরিবর্তে মাদইয়ানের সেই গাছের নিকটে নামায পড়ার কথা উল্লেখ করেছেন যেখানে হযরত মুসা (আঃ) দুইজন মহিলার পশুকে পানি পান করাবার পর বসে পড়েছিলেন।
0 মন্তব্যসমূহ