হযরত ওমর (রাঃ)-এর জীবনী ও ইসলাম গ্রহণ। Biography of Hazrat Omar (R) and Conversion to Islam.musafir120

 

হযরত ওমর (রাঃ)-এর জীবনী ও ইসলাম গ্রহণ। Biography of Hazrat Omar (R) and Conversion to Islam.musafir120

হযরত ওমর (রাঃ)-এর ইসলাম গ্রহণ


হযরত ওমর (রাঃ) তখন ছাব্বিশ বছর বয়স্ক দুর্ধর্ষ যুবক ছিলেন। তিনি অত্যাধিক বলবান, দীর্ঘকায় এবং বীর্যবান পুরুষ ছিলেন। তাঁর বিরাটাকার শরীর গম্ভীর্যপূর্ণ মুখমণ্ডল, তেজোদ্দীপ্ততা দর্শনে অতিদর্পী বীর পুরুষের হৃদয়েও ভয়ের সঞ্চার করত।


ওমর (রাঃ) ইসলাম-পূর্ব কালে পৌত্তলিকতার সমর্থক ছিলেন। ইসলাম আবির্ভাবের পর তিনি ইসলাম ও হযরত মুহাম্মদ (দঃ)-এর বিপক্ষে চরম শত্রুতা শুরু করলেন। নবদীক্ষিত মুসলিম নর-নারী সবাই ওমর (রাঃ)-কে ভয় করে চলতেন।


দিকে কাফির কোরায়েশগণ দেখল যে, মক্কায় এক-দু করে মুসলমানের সংখ্যা ক্রমে বেড়েই চলেছে। সাথে সাথে দু'একজন অমিত তেজা সাহসী কোরায়েশও ইসলাম গ্রহণ করছে। বিদেশে ও দূর-দারাজ এলাকায় ইসলামী প্রচার খুব চলছে।। ইহা কোরায়েশদের জন্য অশুভ লক্ষণ ছাড়া আর কিছুই নয়। যদি এভাবে আরও কিছু দিন চলে তাহলে সবখানে ইসলামের জয় জয়কার শুরু হয়ে যাবে আর তাদের বাপ দাদাদের ধর্মের কোন অস্তিত্বই থাকবে না। তারা খুবই ভাবনায় পড়ে গেল। অবশেষে দারুন নাদওয়ায় একটি বড় রকমের বৈঠক ডেকে তারা কার্যকরী সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্রতী হল। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হল যে, হযরত মুহাম্মদ (দঃ)-কে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে হবে। তাহলেই ইসলামের অস্তিত্ব বিপন্ন এবং কোরায়েশদেরও আর ভাবনার কিছু থাকবে না। কিন্তু এ দুসাহসী কাজের ভার কে নিবে-কে মুহাম্মদ (সঃ)-কে হত্যা করতে যাবে। আবু জেহেল দাঁড়িয়ে ঘোষণা করল, তোমাদের মধ্যে যে মুহাম্মদ ‌(সঃ)-এর শিরচ্ছেদ করে আনতে পারবে, তাকে আমি একশত উষ্ট্র এবং পাঁচশত স্বর্ণ মুদ্রা পুরস্কার দান করব। কে আছ এমন বীর্যবান বীর, এখনি ঝাঁপিয়ে পড়। আমি আমাদের লাত মানাত দেবতাদের শপথ করে বলছি, কোনক্রমে আমার এ প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করব না। মুহাম্মদ (সঃ)-এর হত্যকারীর পুরস্কার প্রাপ্তি সুনিশ্চিত।


দুর্ধর্ষ ওমর (রাঃ) সমবেত কোরায়েশ জনতার মধ্য থেকে দাঁড়িয়ে বলল, আমিই মুহাম্মদ (দঃ)-এর শির ছেদন করে আনব। এ কথা বলে সে কাবা গৃহের হবন দেবতাকে সাক্ষী রেখে তখনই উদ্দেশ্য সাধন করার লক্ষ্যে উলঙ্গ তারবারী হাতে রওয়ানা হয়ে গেল। সে সময়ে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) সাহারী আকারামা (রাঃ) গৃহে অবস্থান করছিলেন এবং উপস্থিত কতিপয় সাহাবীকে ধর্মোপদেশ দানে নিয়জিত ছিলেন।


ওমর (রাঃ)-এর পথিমধ্যে জোহরা কবিলার এক ব্যক্তির সাথে সাক্ষাত হল। তিনি গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। কোরায়েশদের ভয়ে তার প্রকাশ করেন নি। তিনি ওমর (রাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, কি হে ওমর! তুমি তরবারী নিয়ে কোথায় চলেছ?


-মুহাম্মদ (সঃ)-এর মস্তক ছেদন কাজে প্রতিজ্ঞা বদ্ধ হয়েছি। তা-ই ম্পন্ন করার জন্য চলেছি।

-আচ্ছা ওমর! তুমি সম্মুখস্ত ঐ মেষ শাবকটি একটু ধরে দাও না! ওমর (রাঃ) অনেক চেষ্টা করেও তা ধরতে সক্ষম হল না। তখন সে ব্যক্তি বললেন, তুমি যখন এই সামান্য মেষ শাবকটি ধরতে পারলে না, তখন আল্লাহর সিংহ সেই মুহাম্মদ (সঃ)-কে কেমন করে হত্যা করবে বল তো!


একথা শুনে ওমর (রাঃ) কিছুটা লজ্জিত হল।


লোকটি আবার ওমর (রাঃ)-কে বললেন, তুমি যদি তাঁকে আক্রমণ কর, তবে মুহাম্মদ যে গোত্রের সন্তান সে বনু হাশিম ও বনু আবদুল মুতালিবের গোত্রের লোকেরা তোমাকে খন্ডবিখণ্ড করে ফেলবে। অতএব আমি বলি, এ আকাঙ্খা পরিত্যাগ কর।


তার কথা শুনে ওমর (রাঃ) ক্রোধান্বিত ভাবে বলল, তুমি বুঝি মুহাম্মদ (সঃ)-এর ধর্মে দীক্ষিত হয়েছ? তুমি মুসলমান হয়ে থাকলে আমি আগে তোমাকেই শেষ করে নেই। একথা বলে সে তার দিকে অগ্রসর হল। -না, আমি পৈত্রিক ধর্ম পরিত্যাগ করিনি।


একথা শুনে ওমর আবার নিজ পথে চলে গেল। কিছু দূর অগ্রসর হওয়ার পর তার নঈম ইবনে আবদুল্লাহর সাথে দেখা হয়ে গেল। নঈম তাকে এভাবে দ্রুত পদে গমন করতে দেখে যাত্রার কারণ জিজ্ঞাসা করায় সে স্বীয় অভিপ্রায় তাঁর কাছে ব্যক্ত করল। নঈম এ গুরুতর কাজ থেকে বিরত থাকতে বললে সে তাঁকে হত্যা করার জন্য উদ্যত হল।


নঈম বললেন, ওমর! আমি তো পৈতৃক ধর্মেই স্থির আছি। তবে একটি কথা শোন, তুমি যে মুহম্মদ (সঃ)-কে হত্যা করতে চলেছ, তার আগে তো তোমার নিজ ঘর সামলানো দরকার। তোমার বোন ফাতেমা ও তার স্বামী সাঈদ যে মুহাম্মদ (সঃ)-এর ধর্ম গ্রহণ করেছে, সে খবর হয়ত এখনও শুনতে পাও নি


একথা শুনে ওমর (রাঃ) বলল, তাই নাকি? সে তখন পথ পরিবর্তন করে বোনের গৃহ অভিমুখে দৌড়িয়ে ছুটল। গৃহে প্রবেশ করার পূর্ব মুহূর্তে সে তাঁদের কণ্ঠে কোরআন পাঠের শব্দ শুনতে পেল। কিন্তু ওমর (রাঃ)-এর আগমনে সাড়া পেয়ে তার ভগ্নি কোরআনের লিখিত অংশটি দ্রুত লুকিয়ে ফেললেন।


ওমর (রাঃ) জিজ্ঞাসা করল, তোমরা দুজনে এতক্ষণ কি পাঠ করছিলে? কিন্তু তাঁরা কোন উত্তর না করায় ওমর (রাঃ) বলল, তোমরা তাহলে ধর্ম ত্যাগ করেছ? এ কথা বলে সে ক্রোধান্ধ হয়ে প্রথমে ভগ্নিকে প্রহার শুরু করল। ভগ্নিপতি তাঁকে রক্ষা করতে এলে তাঁকেও ভূতলে ফেলে দিয়ে মারাত্বকভাবে প্রহার করতে লাগল। স্বামীর দুর্দশা দেখে ফাতেমা আহতাবস্থায় তাঁকে রক্ষা করার জন্য ওমর (রাঃ)-এর সম্মুখে দাঁড়ালে সে তাঁকে এমন জোরে মুষ্টাঘাত করল যে তাতে তাঁর মুখমণ্ডল রক্তাক্ত হয়ে গেল। ওমর (রাঃ) কিন্তু তখনও সাঈদ (রাঃ)-কে আঘাত করছিল। তাতে তাঁর চেতনা রহিত হওয়ার উপক্রম হয়ে গেল।


ফাতিমা (রাঃ) ওমর (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে বলে উঠলেন, ধর্মদ্রোহী ওমর! তুমি কি ভেবেছ যে, তোমার এই নিষ্ঠুরতার দ্বারা আমাদেরকে আল্লাহর দ্বীন থেকে ফিরাতে পারবে? তা কখনও সম্ভব নয়। আমরা প্রাণের মায়া ত্যাগ করতে পারি কিন্তু এ দীন আমরা পরিত্যাগ করব না। ভগ্নির কথা শুনে ওমর (রাঃ) তাঁর মুখের দিকে দৃষ্টিপাত করে দেখল, ভগ্নির চেহারা রক্তের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে। এ দৃশ্য কেই তার মনের ভিতরে হঠাৎ কি এক ভাবের উদয় হল। সে ভাবতে লাগল। তাঁর বোন ও ভগ্নিপতি মুহাম্মদ (সঃ)-এর দীনের ভিতরে কি এমন বস্তু পেয়েছে যে, তারা এত অত্যাচার সহ্য করেও এমন অবিচল ভাব ও কঠোর সঙ্কল্প প্রদর্শন করছে? এরূপ ভাবান্তরের কারণে ওমর (রাঃ) তার বোনকে বলল, আচ্ছা তোমরা যা পাঠ করছিলে আমাকে শুনাও তো দেখি! তখন ফাতিমা (রাঃ) সেই লুকায়িত কোরআনের অংশ এনে ওমর (রাঃ)-এর সম্মুখে রাখলেন। উহা ছিল সূরা "তোয়াহা"। ওমর (রাঃ) নিজেই তা' পড়তে শুরু করলেন এবং পড়ে এ পর্যন্ত আসল।—'ইন্নানী আনাল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা আনা ফা'বুদনী অ আক্কিমিছ ছালাতা লি যিকরী'।


অর্থাৎ আমিই খোদা, আমি ছাড়া আর কোন মাবুদ নেই। সুতরাং আমারই উপাসনা কর এবং আমার স্মরণার্থে নামায আদায় কর।


এ পর্যন্ত পৌঁছতেই সে এত প্রভাবিত হল যে, হঠাৎ উচ্চ কণ্ঠে বলে উঠল-'না ইলাহা ইল্লাল্লাহ'-একমাত্র তিনি ছাড়া আর কোন উপাস্য নেই। তারপর সে সেখান থেকে সোজা হযরত রাসূলে করীম (সঃ)-এর


উদ্দেশ্যে রওয়ানা হল। এবং আরকাম (রাঃ)-এর গৃহ দরজার কাছে গিয়ে পৌছল। তার হাতে তখনও তরবারীখানা ছিল। উপস্থিত সাহাবাগণ ওমর (রাঃ)-এর হঠাৎ এভাবে আগমন দেখে ভয় পেয়ে গেলেন। কিন্তু হযরত হামজাহ (রাঃ) বললেন, কি হয়েছে, আসুক না সে, যদি কোন সৎ উদ্দেশ্যে এসে থাকে ভাল কথা, আর যদি কোন অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এসে থাকে, তবে তার তরবারী দিয়েই তার মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলব।


হযরত ওমর (রাঃ) নীরবে গৃহ মধ্যে প্রবেশ করা মাত্র হযরত রাসূলে করীম (সঃ) এগিয়ে এসে ওমর (রাঃ)-এর একটি হাত সজোরে চেপে ধরে বললেন, কি ওমর! কি উদ্দেশ্য নিয়ে আগমন করেছ? হযরত নবী করীম (সঃ)-এর মুক নিঃসৃত এ প্রশ্ন শুনা মাত্র ওমরের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল।


লক্ষ্যণীয় ও চিন্তনীয় ব্যাপার বটে! আরবের সর্বজন ত্রাস, অসম শক্তি-সাহস ও তেজবীর্যের অধিকারী ওমর (রাঃ), যাকে দেখে-নাম শুনে সবাই কম্পিত, সেই ওমর (রাঃ) যাঁর একটি মাত্র গম্ভীর প্রশ্নে থর থর করে কেঁপে উঠল। আল্লাহর নবীদের মানসিক শক্তির প্রভাব যে কি ভীষণ তা এই ক্ষুদ্র একটি ঘটনার মধ্য দিয়েই অনুভব করা যায়।


ওমর (রাঃ) অত্যন্ত বিনীত ভাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রশ্নের জবার দিলেন, ঈমান গ্রহণ করার উদ্দেশ্যে এসেছি। আনন্দে ও খুশীর আধিক্যে রাসূল (সঃ)-এর মুখ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উচ্চারিত হল 'আল্লাহু আকবার'। সমবেত সাহাবাবৃন্দও প্রতিধ্বনি করলেন। তারপর ওমর কে রসূলুল্লাহ (সঃ) ইসলামে দীক্ষিত করলেন।


হযরত ওমর (রাঃ)-এর ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর মুসলমানদের মনের সাহস অনেক বৃদ্ধি পেল। এতদিন তারা প্রকাশ্যে ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলি পালন করতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। কাবা গৃহে জামাতে নামায আদায় করা ছিল প্রায় অসম্ভব। ওমর (রাঃ)-এর ইসলাম গ্রহণের পর সে অবস্থার অনেকটা পরিবর্তন হল। তিনি নিজের ইসলাম গ্রহণ করার কথা প্রকাশ্যভাবেই ঘোষণা করে দিলেন। কাবাগৃহে মুসলমানদের নামায আদায় করাও শুরু হয়ে গেল। প্রথম যেদিন তাদের জামাত শুরু হল কোরায়েশগণ দলবদ্ধ হয়ে তাদেরকে আক্রমণ করার উদ্যোগ নিল। কিন্তু হযরত ওমর (রাঃ) এবং বীর হামজাহ (রাঃ)-এর রক্তলোচন ও তেজস্বিতার ভয়ে ভীত হয়ে তারা আর অগ্রসর হল না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ