নেফাসের মাসআলা মাসায়েল। নেফাস অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াতের হুকুম ।


নেফাস কি? নেফাসের সময় সীমা!

   সন্তান প্রসব হওয়ার পর পেশাবের রাস্তা দিয়ে যে স্রাব হয়, তাহাকে নেফাস বলে। 

নেফাসের মুদ্দত (মেয়াদ) ঊর্ধ্ব সংখ্যায় চল্লিশ দিন। চল্লিশ দিন অপেক্ষা বেশী নেতাস হইতে পারে না। কমের কোন সীমা নাই। যদি কাহারও এক দুই ঘণ্টা মাত্র রক্তস্রাব হইয়া বন্ধ হইয়া যায়, তবে মাত্র ঐ এক দুই ঘন্টাকেই নেফাস বলা হইবে।


মাসআলা:-১

যদি কাহারও প্রসবের পর রক্তস্রাব মাত্রই না হয়, তবুও তাহার উপর গোছল ফরয হইবে।

 মাসআলাঃ-২

প্রসবের সময় সন্তানের অর্ধেকের বেশী বাহির হওয়ার পর যে রক্তস্রাব হইবে উহা নেফাস হইবে। আর যদি অর্ধেকের কম বাহির হওয়ার পর রক্তস্রাব হয়, তবে উহা এস্তেহাযা হইবে। অতএব, যদি হুঁশ থাকে, তবে নামাযের ওয়াক্ত হইলে ঐ অবস্থায়ও অযু করিয়া নামায পড়িতে হইবে। নামায না পড়িলে গোনাহগার হইবে; এমন কি ইশারায় হইলেও নামায পড়িতে হইবে। খবরদার! হুঁশ থাকিয়া নামায কাযা করিবে না। অবশ্য যদি নামায পড়িলে সন্তানের জীবন নাশ হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে সন্তানের জীবন রক্ষার্থে নামায ছাড়িয়া দিবে (ঐ সময় এস্তেগফার পড়িবে)।


মাসআলা-৩

 যদি কোন মেয়েলোকের গর্ভপাত হয় এবং সন্তানের এক আধটা অঙ্গ পরিষ্কার দেখা যায়, তবে গর্ভপাতের পর যে রক্তস্রাব হইবে উহাকে নেফাস ধরিতে হইবে। আর যদি সন্তানের মাত্রও আকৃতি না দেখা যায়, শুধু মাত্র একটা মাংসপিও দেখা যায়, তবে দেখিতে হইবে যে, ইতিপূর্বে অন্ততঃপক্ষে পনর দিন পাক ছিল কি না এবং রক্তস্রাব কমপক্ষে তিন দিন তিন রাত জারী থাকে কি না। যদি এরূপ হয়, তবে উহাকে হায়েয গণ্য করিয়া হায়েযের কয় দিন নামায-রোয়া পরিত্যাগ করিতে হইবে। আর যদি এইরূপ না হয়, তবে ঐ রক্তস্রাণকে এস্তেহাযা ধরিতে হইবে।

মাসআলা-৪

যদি কোন মেয়েলোকের প্রসবান্তে চল্লিশ দিনের বেশী রক্তস্রাব হয় এবং তাহার ইহাই প্রথম প্রসব হয়, তবে চল্লিশ দিন পর্যন্ত নেফাস ধরিতে হইবে। চল্লিশ দিন যখন পুরা হইবে, তখন গোছল করিয়া নামায পড়িতে হইবে। আর যদি ইতিপূর্বে আরও সন্তান প্রসব হইয়া থাকে এবং তাহার নেফাসের মুদ্দতের কোন নিয়ম থাকে, তবে নিয়মের কয়দিন নেফাস হইবে, বেশী কয়দিন এস্তেহাযা হইবে।


মাসআলা-৫ 

কোন মেয়েলোকের নিয়ম ছিল, প্রসবান্তে ত্রিশ দিন রক্তস্রাব হওয়ার, কিন্তু একবার ত্রিশ দিন চলিয়া যাওয়ার পরও রক্ত বন্ধ হইল না; তাহা হইলে এই মেয়েলোক এখন গোছল করিবে না, অপেক্ষা করিবে। যদি পূর্ণ চল্লিশ দিনের শেষে বা চল্লিশ দিনের ভিতর রক্ত বন্ধ হয়, তবে সব কয়দিনই নেফাসের মধ্যে গণ্য হইবে। আর যদি চল্লিশ দিনের বেশী রক্তস্রাব জারী থাকে, তবে ত্রিশ দিন নেফাসের মধ্যে গণ্য হইবে; অবশিষ্ট কয় দিন এস্তেহাযা। চল্লিশ দিনের পর গোছল করিবে এবং নামায পড়িবে। ত্রিশ দিনের পরের দশ দিনের নামায কাযা পড়িবে।


মাসআলা-৬

 যদি চল্লিশ দিনের পূর্বেই নেফাসের রক্তস্রাব বন্ধ হয়, তবে স্রাব বন্ধ হওয়া মাত্রই গোছল করিয়া নামায পড়িতে হইবে। গোছল করিলে যদি স্বাস্থ্যের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা প্রবল হয়, তবে তায়াম্মুম করিয়া নামায পড়িবে। খবরদার। এক ওয়াক্ত নামাযও কাযা হইতে দিবে না।


মাসআলা-৭

নেফাসের মধ্যেও হায়েযের মত নামায একেবারে মাফ। কিন্তু রোযার ক্বাযা রাখিতে হইবে এবং নামায, রোযা ও স্বামী-স্ত্রীর মিলন সবই হারাম।

 

মাসআলা-৮ 

কোন মেয়েলোকের যদি ছয় মাসের ভিতরে আগে পরে দুইটি সস্তান প্রসব হয়, যেমন প্রথম সন্তান প্রসব হওয়ার দুই চারি দিন পরে বা দশ বিশ দিন পরে যদি দ্বিতীয় সন্তান প্রসব হয়, তবে প্রথম সন্তান প্রসবের পর হইতেই নেফাসের মুদ্দত গণনা করিতে হইবে—দ্বিতীয় সন্তান হইতে নহে।


নেফাস অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াতের হুকুম


 মাসআলা-১

যে মেয়েলোক হায়েয বা নেফাসের অবস্থায় আছে, অথবা যাহার উপর গোছল ফরয হইয়াছে, তাহার জন্য মসজিদে প্রবেশ করা, কা'বা শরীফের তওয়াফ করা, কোরআন শরীফ পাঠ করা এবং স্পর্শ করা দুরুস্ত নাই।

 অবশ্য কোরআন শরীফ যদি জুযদানের ভিতর থাকে অথবা রুমাল দ্বারা পেঁচান থাকে, তবে জুযদানের ও রুমালের উপর দিয়া ধরা জায়েয আছে। কিন্তু চামড়া, কাপড় বা কাগজ যদি কোরআন শরীফের সঙ্গে সেলাই করা না থাকে, তবে তাহা দ্বারা উপরোক্ত অবস্থায় কোরআন শরীফ স্পর্শ করা জায়েয আছে। সেলাই করা থাকলে স্পর্শ করা যাবে না।


 মাসআলা-২

 যাহার ওযু নাই তাহার জন্যও কোরআন শরীফ স্পর্শ করা জায়েয নহে, অবশ্য পড়াতে বাধা নাই।


 মাসআলা-৩

 যদি টাকা পয়সা (বা নোটের মধ্যে,) অথবা তশতরী,তাবীয বা যে-কোন পাতা বা কাগজের মধ্যে কোরআনের আয়াত লেখা থাকে, তবে তাহাও উপরোক্ত অবস্থাসমূহে অর্থাৎ, বিনা ওযুতে, হায়েয নেফাস এবং জানাবাতের অবস্থায় স্পর্শ করা জায়েয নহে। অবশ্য যদি এ সমস্ত জিনিস কোন থলির মধ্যে বা অন্য কোন পাত্রের মধ্যে থাকে, তবে সে থলি বা পাত্র ধরিতে বা উঠাইতে পারে।

মাসআলা-৩

 (উপরোক্ত অবস্থাসমূহে পরনের কাপড়ের আঁচল দিয়া বা গায়ের জামার আস্তিন বা দামান দিয়াও কোরআন শরীফ স্পর্শ করা জায়েয নহে।) অবশ্য যে কাপড়, চাদর, রুমাল উড়নী বা জামা পরিধানে নাই—পৃথক আছে, তাহা দ্বারা কোরআন শরীফ ধরা জায়েয আছে।


 মাসআলা-৫

কেউ যদি পূর্ণ আয়াত না পড়ে; বরং আয়াতের সামান্য শব্দ অথবা অর্ধেক আয়াত পড়ে, তবে দুরুত্ত আছে, কিন্তু ঐ অর্ধেক আয়াত এত বড় না হওয়া চাই যে, ছোট একটি আয়াতের সামান হইয়া যায়। 

 মাসআলা-৬

 উক্ত অবস্থায় দো'আয়ে কুনূত পড়া জায়েয আছে।


মাসআলা-৭

যদি কোন মেয়েলোক মেয়েদেরে কোরআন শরীফ পড়ায়, তবে এমতাবস্থায় বানান করান দুরুস্ত আছে, মিলাইয়া পড়াইবার সময় পূর্ণ আয়াত পড়িবে না বরং একটা কিংবা দুইটা দুইটা শব্দের পর শ্বাস ছাড়িয়া দিবে এবং কাটিয়া কাটিয়া আয়াতকে মিলাইয়া বলিয়া দিবে।


মাসআলা-৮

 উপরোক্ত অবস্থাসমূহে কলেমা শরীফ পড়া, দুরূদ শরীফ পড়া, আল্লাহর যেকের করা, এস্তেগফার পড়া, তসবীহ্ পড়া অর্থাৎ, সোবহানাল্লাহ্, আল্হামদুলিল্লাহ্, লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার, লা-হাওলা ওয়ালা কুওওয়াতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিয়্যিল আযীম ইত্যাদি পড়া জায়েয আছে।


মাসআলা-৯

 হায়েযের অবস্থায়ও ওযু করিয়া পাক জায়গায় কেব্‌লামুখী হইয়া বসিয়া নামাযের সময়টুকু আল্লাহর যেকেরে মশগুল থাকা মোস্তাহাব। যেন নামাযের অভ্যাস ছুটিয়া না যায়, পাক হওয়ার পর নামায পড়িতে ঘাবড়াইয়া না যায়।


মাসআলা-১০

কোন মেয়েলোকের উপর গোছল ফরয হইয়াছিল। গোছল না করিতেই হায়েয আসিয়া গেল। এই অবস্থায় তাহার আর গোছল করার দরকার নাই, যখন হায়েয হইতে পাক হইবে, তখন এক গোছলেই উভয় গোছল আদায় হইয়া যাইবে।


আরো জানুনঃ-

হায়েযের মাসআলা

হায়েযের হুকুম আহকাম

যে চার কারনে গোসল ফরজ হয়

স্বামী স্ত্রীর গোপনীয় মাসআলা

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ